এক লাখ টাকায় মেলে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট

এক লাখ টাকা খরচ করলেই বাংলাদেশি পাসপোর্ট মিলছে রোহিঙ্গাদের। তাদের সহায়তা করছে বাংলাদেশেরই দালাল চক্র। এখন সফটওয়্যারের সঙ্গে ইন্টারভিউ মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করার কাজ করছে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতর। গত এক বছরে অবৈধ উপায়ে পাসপোর্ট সংগ্রহের অভিযোগে কমপক্ষে চারশ’ রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ আটক হয়েছেন।

এক প্রতিবেদনে ডয়চে ভেলে বলছে, গত সপ্তাহে টেকনাফের হ্নীলা জাদিমুরা এলাকায় যুবলীগ নেতা হত্যার আসামি রোহিঙ্গা নূর মোহাম্মদ পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুক যুদ্ধে’ নিহত হন। সে সময় তার কাছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়া যাওয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় দেশজুড়ে। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী তিন রোহিঙ্গা যুবক আটক হওয়ার পর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার নানা কাহিনী ও কৌশলের কথা জানা যাচ্ছে।

ওই তিন যুবকের মধ্যে দুজন হলেন- মিয়ানমারে মংডু জেলার অংচি গ্রামের আলী আহমদের ছেলে মো. ইউসুফ ও মো. মুসা, আরেকজন মিয়ানমারের একই এলাকার মো. আজিজ। তারা গত ডিসেম্বর নোয়াখালীর সেনবাগের ঠিকানা ব্যবহার করে এনআইডি সংগ্রহ করেন, পরবর্তীতে নোয়াখালীর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করেন পাসপোর্ট। শুধু পাসপোর্ট নিয়ে বসে থাকেননি তারা। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলেন, সেই পাসপোর্ট দিয়ে তুরস্কের ভিসার আবেদন করতে।

চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ড এবং পাসপোর্ট দালালরা করে দিয়েছে। দালালরাই তাদের ওই কাজের সময় নোয়াখালী নিয়ে কয়েকদিন রেখেছিল। তিন জন দালালের নাম তারা জানিয়েছে। তারা ওই তিন দালালকে তিনটি পাসপোর্টের জন্য যথাক্রমে এক লাখ পাঁচ হাজার, ৯০ হাজার এবং ৬০ হাজার টাকা দিয়েছে। দুটি পাসপোর্ট করা হয় ডিসেম্বরে এবং একটি জানুয়ারি মাসে। সারাদেশেই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট করে দেওয়ার জন্য এইরকম আরও অনেক দালাল চক্র আছে বলেও জানান জানান মোস্তাফিজুর রহমান।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসেও গত এক মাসে আরও চারজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন। বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবু সাঈদ বলেন, আমরা মূলত ইন্টারভিউ করে ওই চারজনকে শনাক্ত করে পুলিশে দিয়েছি। কিছু কৌশগত প্রশ্ন করলেই তারা ধরা পড়ে যায়। আবার ভাষার কারণেও ধরা পড়ে। যেমন বাংলাদেশি নাগরিক হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে সে বলতে পারবে। তবে দালালরা আমাদের কৌশল জেনে যায়। তাই আমাদেরও কৌশল পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধনের কাগজ তারা কীভাবে জোগাড় করে এটাই প্রশ্ন।

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজারের উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের এই কৌশলের একটি ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ধরুন, ময়মনসিংহে এক নারীর নাম মরিয়ম। তিনি বাংলাদেশেরই নাগরিক। তার ন্যাশনাল আইডি কার্ড জোগাড় করে নাম, ঠিকানা, পিতা বা স্বামীর নাম সবই ঠিক রাখা হয়। এই একটি ডকুমেন্ট ধরেই আরও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট পাওয়া যায়। এরপর ওই নামেই আরেক রোহিঙ্গা নারীর জন্য পাসপোর্টের আবেদন করা হয়। এই দুর্নীতির সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের নিম্ন পর্যায়ের কিছু কর্মচারীও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সোহায়েল হোসেন খান বলেন, আমরাই তো রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করছি। এ পর্যন্ত পাসপোর্টের আবেদন করতে আসা কয়েকশ’ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে পুলিশে দিয়েছি। তবে তারা আবেদনের আগে এনআইডি, জন্ম নিবন্ধন কীভাবে পায় তা তো আমরা বলতে পারব না। তারা তো পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টও পায়।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের সব পাসপোর্ট অফিসকে সতর্ক করেছি। এখন আমরা সফটওয়ার ব্যবহার করছি ভুয়া আবেদন ধরার জন্য। আর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমেও শনাক্ত করছি। বিশেষ করে আমাদের কাছে দেওয়া ফিঙ্গার প্রিন্ট, রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট এবং এনআইডির ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে দেখছি। তিনি অভিযোগ করেন, রোহিঙ্গাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট আমরা এনআইডি প্রকল্পকে দিয়েছি। তারপরও তো রোহিঙ্গারা এনআইডি পাচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের যে তালিকা, ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আছে, তার বাইরেও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছেন। চট্টগ্রাম এলাকায় অন্তত ৭৩টি সন্দেহজনক এনআইডি দেখা গেছে সার্ভারে। এ নিয়ে ঢাকায় এই প্রকল্পের দায়িত্বশীল কাউকে কথা বলার জন্য পাওয়া যায়নি। তবে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনির হোসাইন খান বলেন, এটা খতিয়ে দেখার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে ঢাকা থেকে। তার একজন সদস্য উপসচিব খুরশিদ আলম এরই মধ্যে চট্টগ্রামে আছেন তদন্তের জন্য। রোহিঙ্গারা কীভাবে এনআইডি পায় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটা তদন্ত শেষে বলা যাবে।

গত বছরের এপ্রিলে তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে অবৈধ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে অবৈধ উপায়ে পাসপোর্ট সংগ্রহের অভিযোগে কমপক্ষে চারশ’ রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ আটক হয়েছেন।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে আমরা

পুরানো সংবাদ
সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১